মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব কাটানোর কৌশল হিসেবে চীন থেকে অন্য দেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কারখানা স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করে আসছিলেন অনেক রফতানিকারক। কিন্তু কৌশলটি এখন তেমন কাজে আসছে না। কারণ সম্ভাব্য উৎপাদন কেন্দ্রে নতুন শুল্ক আরোপ এবং ট্রান্সশিপমেন্টের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ায় চীন থেকে কারখানা সরানো লাভজনক মনে হচ্ছে না তাদের। ফলে এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেন্দ্রিক সরবরাহ চেইন পুনর্গঠনের বিষয়টি নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। খবর এফটি।
চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন কিছু নয়, বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি এতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। কারণ আগে থেকেই চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল অবলম্বন করে আসছে দেশটির মূল ভূখণ্ডে বিনিয়োগকারী অনেক প্রতিষ্ঠান। এর অংশ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়ে আসছে। এখন চীননির্ভরতা কাটানোর এ কৌশল আরো বিপত্তির কারণ হয়ে উঠেছে বলে মত কোনো কোনো বিশ্লেষকের।
এপ্রিলে আকাশছোঁয়া শুল্কের মাধ্যমে বিবাদ বাড়ালেও এখন চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ৩০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের পণ্যের ওপর শুল্কহার আরোপ করা হয়েছে ১০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর আরোপিত শুল্ক এখনো চীনের পণ্যের গড় শুল্কের তুলনায় কম। তবু ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কাঘাত চীনের বাইরের কারখানাগুলোয় মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে। এতে চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেয়ার সুবিধা তেমন একটা পাবে না উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
চীন থেকে তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে এমন সব পণ্যের ওপর গত বৃহস্পতিবার এককভাবে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের এশিয়াবিষয়ক অর্থনীতিবিদ লুইস লু বলেন, ‘চায়না প্লাস ওয়ান কৌশল এখন বিরাট চাপে পড়তে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কিছু কোম্পানি আরো দূরের দেশে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তবে অনেকে আবার চীনেই ফিরে যাবে। কারণ নতুন বাজারে যাওয়ার প্রাথমিক খরচ পড়বে অস্বাভাবিক রকমের বেশি।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত এপ্রিলে চীনা পণ্যে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন। তখন দেশটির অনেক কোম্পানি বিদেশে বিনিয়োগ বাড়িয়েছিল। এখন তারা বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে শুল্ক আরোপে বেকায়দা অবস্থা তৈরি হয়েছে।
চীনের মিনইউয়ান ফুটওয়্যারের কর্মকর্তা লিন সিজিয়ে বলেন, শুল্ক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বেশির ভাগ মার্কিন ক্রেতার জোর দাবি ছিল যে উৎপাদন যেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। আমাদের কোম্পানি কম্বোডিয়ায় বড় একটি কারখানাও চালু করেছে। কিন্তু যারা এখনো কম্বোডিয়ায় ক্রয়াদেশ দেয়নি, সাম্প্রতিক শুল্কের প্রভাব নিয়ে তারা দ্বিধায় ভুগছে।
বেলজিয়ামভিত্তিক সোর্সিং কোম্পানি ড্রাগন সোর্সিংয়ের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড লাউব জানান, প্রথম দিকে মার্কিন ক্রেতারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন সরবরাহকারী খুঁজেছেন। কিন্তু এখন শুল্কনীতিজনিত অস্থিরতা না থামা পর্যন্ত অনেকেই আবার চীন থেকেই কেনাকাটা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ওয়াশিংটন-বেইজিং এবং অন্য অংশীদারদের মধ্যকার বাণিজ্য আলোচনার পাশাপাশি চীন ও বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর শুল্ক পার্থক্য সরবরাহ চেইনে কী প্রভাব ফেলবে তা এখন ক্রেতাদের বিবেচনার বিষয় বলে জানান রিচার্ড লাউব। কারণ চীনের সঙ্গে অন্য দেশের শুল্ক পার্থক্য বেশি না হলে তারা চীনকেই বেছে নেবেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন আকারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করেছেন। সিঙ্গাপুরের ওপর সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে মিয়ানমার ও লাওসের ওপর সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন তিনি; কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনের ওপর ১৯ শতাংশ। অন্যদিকে চায়না প্লাস ওয়ান বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ভিয়েতনামের ওপর শুল্ক নির্ধারিত হয়েছে ২০ শতাংশ।
কম্বোডিয়া ও ফুজিয়ানে কারখানা রয়েছে উপহারসামগ্রী নির্মাতা কোয়ানঝৌ ভিশন গিফটসের। কোম্পানিটির সেলস স্পেশালিস্ট ভেরা লি জানান, ১৯ শতাংশ শুল্ক এখনো কম্বোডিয়ার জন্য কিছু মাত্রায় সুবিধাজনক, তবে সেটি ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
হংকংভিত্তিক খেলনা ও ইলেকট্রনিকস নির্মাতা উইনউড করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ব্রায়ান্ট চ্যান জানান, সরবরাহ ঝুঁকি কমাতে কিছু ক্রয়াদেশ দক্ষিণ চীনের ডংগুয়ান থেকে ইন্দোনেশিয়ায় স্থানান্তরের বিষয়ে অংশীদারদের সঙ্গে আলাপ চলছিল। তবে পরিস্থিতি বলছে, বেশির ভাগ উৎপাদন চীনেই করতে হবে।
তবে উচ্চমূল্যের কাপড় ও পোশাকের মতো কিছু খাতে অতিরিক্ত শুল্ক চীনের আধিপত্যে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। কারণ খুব কম দেশই চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে এ খাতে পাল্লা দিতে পারে বলে জানান ঝেজিয়াং প্রদেশের ব্যবসায়ী নভিন ঝা।
ডংগুয়ানে চারটি খেলনার কারখানা পরিচালনাকারী ঝাও ফেন জানান, তার অনেক সহকর্মী ভিয়েতনামে কারখানা খোলা নিয়ে এখন আফসোস করছেন। দেশটিতে জমির মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমের দক্ষতা কম এবং বাড়তি শুল্কের কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে গেছে।
তিনি আরো বলেন, ‘কম খরচের চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আসলে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি এবং মার্কিন ক্রেতাদের চাহিদাও কমেনি। বাস্তবে মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল।’